রাজৈর উপজেলার খালিয়া ইউনিয়নের কুমারপল্লীর শিল্পীদের কথা

kumari palli

মাদারীপুর জেলার রাজৈর উপজেলার খালিয়া ইউনিয়নের পালপাড়ায় বা কুমারপল্লীতে প্রায় ৪০০ বছর ধরে পটের ছবি অাঁকা হয়। এ ধারা চলে আসছে বংশপরম্পরায়। ২০ বছর বয়সী প্রতিমা পাল জানান, ভোর ৫টায় তিনি সরা অাঁকতে বসেন। রাত ১২টা থেকে এঁকে যেতে হয়। দুর্গা পূজার পর পরই লক্ষ্মী পূজা ভাদ্র-আশ্বিন ২ মাস সরাচিত্র তৈরি করার সময়, আশ্বিন মাসে দুর্গা পূজা তারপরই লক্ষ্মী পূজা। ফলে এ কয়টা দিন পরিবারের সবাইকে পটে ছবি অাঁকতে হয়। এ সময় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পট বিক্রেতারা বায়না করে যান মোটামুটি তিন-চারদিনের মধ্যে সরা তৈরি করে দিতে হয়। মাদারীপুর-গোপালগঞ্জ জেলার আশপাশ থেকেই সাধারণত অর্ডারগুলো আসে। প্রতিমা পাল বলেন, বাবা যোগেন্দ্রনাথ পাল মাটি কেটে আনেন মাটির সরাগুলো তৈরি করেন মা পূর্ণিমা পাল। মাটি থেকে সরা তৈরি পর্যন্ত মা রান্না-বান্নাসহ সংসার সামলে সরা পোড়ানো কাজে খুব কষ্ট করেন। আমি আর ছোট বোন চম্পা সরা রেডি করি, বাবা ফাইনাল টাচ দিয়ে দেন। পট রঙ করার জন্য সাদা অক্সাইড পাউডারের সঙ্গে বিরজা মিশিয়ে গ্রাউন্ড তৈরি করে দিতে হয়। তার ওপর একটু কালো ও হালকা রঙ বস্নু গ্রাউন্ড করে। এর ওপর হলুদ রঙ দিয়ে লক্ষ্মীর চরিত্রগুলো অাঁকে পটশিল্পীরা। এভাবে ১৫ বারের মতো লক্ষ্মী বা দুর্গার সরা অাঁকা শেষ হয়। শেষে বার্নিশ কোট দিতে হয়। প্রতিমা পাল জানান, আমার দাদাঠাকুর অসীম পাল বিভিন্ন গাছের কষ দিয়ে রঙ তৈরি করতেন। ইটের গুঁড়া হলুদ পুইশাকের বীজের কষ থেকে রঙ নিয়ে বাদী গাছের আঠা, তেঁতুলের বীজের কষ মিশিয়ে রঙ তৈরি করতেন। আমরাও কিছু কিছু ব্যবহার করি। আমার দাদাঠাকুর অসীম পাল তাঁতিহাটির সেরা প্রতিমা শিল্পী। তার কাজে আমাদের খালিয়ার আদি প্রতিমা দেখতে পাবেন। তিনি এখনো নিজের তৈরি রঙ ব্যবহার করেন প্রতিমার গায়ে। আমরা ছাগলের পশম দিয়ে তুলি তৈরি করি। ছাগলের পশমের তুলির কাজ হবে খুব সরু। দেখতে খুব ভালো লাগে। আমরা ৭ বোন ১ ভাই ৫ বোনের বিয়ে হয়েছে। ছোট চম্পা আর আমি এখন কাজ করি। এ খালিয়ার দুর্গার পটও লক্ষ্মীর পট একমাত্র আমার দাদাই অাঁকেন। দাদা ভালো প্রতিমা অাঁকতে পারেন। দুর্গার পট কম বিক্রি হয়। দাদার অাঁকা দুর্গার পট ঢাকার শিল্পী সাহিত্যিকরা কিনে সংগ্রহ করেন। দাদা বছরের অন্য সময় প্রায় বেকার থাকেন। তিনি এখন থাকেন টেকেরহাটে। মা-দিদি লক্ষ্মী পূজায় বেড়াতে এসে আমাদের সঙ্গে করেন। পূজায় বৌদি আমাদের সঙ্গে রাত-দিন কাজ করেন। আমাদের পাল বাড়িতে তিনটি পরিবার সরাপটের ছবি অাঁকেন। অাঁকা লক্ষ্মীর সরা যত চলে, ডাইসে করা সরা ততটা চলে না তবু চাহিদার কারণে আমরা কিছু কিছু তৈরি করি। আমাদের তৈরি সরা চিত্র পাওয়া যায় টেকেরহাট, রাজৈর, মাদারীপুর, ভাঙ্গা, ফরিদপুর, শিবচর, কবিরাজপুর, কালকিনি, মুকসুদপুর কোটালীপাড়া, কাশিয়ানী, ঘাঘর, গোপালগঞ্জ প্রভৃতি এলাকার হাটে-বাজারে। দুর্গা পূজার পর পরই এসব এলাকার হাট-বাজারে পাওয়া যায়। তাঁতিহাটি থেকে মাদারীপুর যেতে সময় লাগে এক ঘণ্টা। মাদারীপুর বাজারে লক্ষ্মীর সরা বিক্রি হয় ৫০ টাকায়। আমরা সরা বানিয়ে পুড়িয়ে এঁকে পাই ৩৫ টাকা ২-৩ মাস সরা তৈরির কাজ করি বাকি সময় হাঁড়ি-পাতিল বানাই। এখন অ্যালুমিনিয়াম আর প্লাষ্টিকের যুগ। মাটির হাঁড়ি চলে না। অনেক কথাই বলার থাকে; কিন্তু কে শুনবে পটের কারিগর এ মেয়ের কথা।

Leave a Reply