ভাঙ্গায় চালকের ঘুমে প্রাণ গেল ২৫ জনের

bus-accident-vanga-faridpur

ফরিদপুরের স্মরণকালের ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় ২৫ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৫ জন মহিলা ও এক শিশু রয়েছে। দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৯ জন। তাদের ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গুরুতর আহত ৮ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। নিহত ২৫ জনের মধ্যে ২২ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাদের স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। আহত যাত্রীরা জানিয়েছেন, চালক ঘুমিয়ে যাওয়ার কারণে এমন দুর্ঘটনা হয়েছে। এ ঘটনায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। মাত্র ছয় বছরের ব্যবধানে ভাঙ্গায় এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা প্রত্যক্ষ করলেন ভাঙ্গাবাসী। এর আগে ২০০৯ সালের ৬ ডিসেম্বর একই এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় ২৪ যাত্রী নিহত হয়েছিলেন।

ভাঙ্গা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ হোসেন জানান, বৃহস্পতিবার রাত দেড়টার দিকে ঢাকা থেকে পটুয়াখালীগামী সোনারতরী পরিবহনের (ঢাকা-মেট্রো-ব-১৪-৭০৭৪) যাত্রীবাহী একটি নাইটকোচ ভাঙ্গার সদরদী নামক স্থানে রাস্তার পাশের বড় একটি গাছের সঙ্গে ধাক্কা খায়। এতে বাসটি দুমড়ে-মুচড়ে গিয়ে অনেকটা লম্বালম্বি দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়।

এ দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন ২০ জন। আহতদের স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হলে সেখানে মারা যান তিনজন। পরে আহতদের ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হলে সেখানে আরও দু’জন মারা যান। ভাঙ্গা থানা পুলিশ ও হাইওয়ে থানা পুলিশের দুটি দল উদ্ধার তৎপরতা চালিয়েছে। পরে ফরিদপুর থেকে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের উদ্ধার করে হাইওয়ে থানায় ও হাসপাতালে পাঠায়। ভোরে ঘটনাস্থলে যান ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক সরদার সরাফত আলী ও পুলিশ সুপার জামিল হাসান। এছাড়া সকালে দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে যান ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান নিক্সন চৌধুরী।

মর্মান্তিক বাস দুর্ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এছাড়া প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ, ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান নিক্সন চৌধুরীও শোক জানিয়েছেন।

ঘুমিয়ে ছিলেন চালক : সোনারতরী বাসে থাকা আহত যাত্রী সিরাজুল জানান, বাসটি ঢাকার গাবতলী থেকে ছাড়ার পর আমিনবাজার পার হওয়ার পর থেকেই বাসের চালক দ্রতগতিতে বাসটি চালাতে থাকে। আমরা অনেকেই বাসচালককে একটু ধীরে চালাতে বলায় সে কোনো কথা শোনেনি। ফেরিঘাট পার হওয়ার পর চালক বেপরোয়া গতিতে বাসটি চালাতে থাকে। কিছুক্ষণ চলার পর হঠাৎ করে বাসটি সজোরে ধাক্কা খেলে আমরা কয়েকজন চিৎকার শুরু করি। এরপর আর কিছু মনে নেই। মনে হয় বাসের চালক ঘুমিয়ে পড়েছিল। দুর্ঘটনার সময় সোনারতরী বাসের পেছনে থাকা একটি গাড়ির যাত্রী পটুয়াখালীর ইয়াকুব আলী জানান, সোনারতরী বাসটি বেশ দ্রুতগতিতে চলছিল। আমাদের বাসসহ কয়েকটি বাস ওভারটেক করে যাওয়ার পর রাস্তার পাশের বড় একটি গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে দুমড়ে-মুচড়ে যায়। কিছুক্ষণ পর পুলিশ এসে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। দুর্ঘটনাস্থলের কাছে থাকা মহাসড়কে ডিউটিরত ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আনসার সদস্য সাইদুর রহমান ও স্বপন হাওলাদার জানান, দ্রুতবেগে গাড়িটি গিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে দু’ভাগ হয়ে যায়। বাস দুর্ঘটনার পর রাস্তার দু’পাশ বন্ধ হয়ে শত শত যানবাহন আটকা পড়ে। পরে ফরিদপুর থেকে রেকার নিয়ে বাসটি সরিয়ে নিলে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

নিহতরা হলেন : নিহত ২৫ জনের মধ্যে ২২ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন- পটুয়াখালীর একই পরিবারের আসমা বেগম (৪৭), আমেনা বেগম (১৪) ও শাহিন (১৯)। বাসের সুপারভাইজার গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুরের শফিকুল ইসলাম (৪২), তাছাড়া পটুয়াখালীর রাসেল (৩০), আবু বক্কার (২২), মাহামুদুল হাসান (২০), শাহরিয়ার (৩৫), রেজাউল ইসলাম (৪০), সূর্য বেগম (৩৮), হেলাল (৩৪), সোহাগ (৩২), কবির ফকির (৩৮), আঁখি আক্তার (৭), বরগুনা জেলার রাবেয়া বেগম (৭০), টুটল (৪৫), রতন (৩০), যশোর জেলার মনিরুল ইসলাম (৩৫), ফরিদপুর সদর উপজেলার হাড়োকান্দি এলাকার মোবারক হোসেন (৩৩), বরিশালের আফজাল (৪০), গাজীপুর জেলার নাজমা বেগম (৩০)। বাকি ৩ জনের পরিচয় পাওয়া যায়নি। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ২২ জনের লাশ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে হাইওয়ে থানা পুলিশ জানিয়েছে।

আহতরা হলেন : পটুয়াখালীর বদ্ধপাড়া গ্রামের একই পরিবারের শাকিব (৮), রাকিব (৫), তার মা ছখিনা বেগম (২৩), ভাই ইসমাইল (১৬), পটুয়াখালীর সোনাউরা গ্রামের রুবি আক্তার (১৫), বরগুনার আমতলী গ্রামের রুবেল (২৭), সম্পা বেগম (২০), সিদ্দিকুর রহমান (৩০), ঝন্টু কাজি (৪০), পটুয়াখালীর কলাপাড়া গ্রামের শাফিয়া বেগম (৪৮), সাতক্ষীরা জেলার কান্তা গ্রামের জাহাঙ্গীর (২৫), ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার গুনবহা ইউনিয়নের মনির (৩০), বরিশালের জহির (২৭), বরগুনার তালতলী গ্রামের বারেক হাওলাদার (৫০), তুহিন (২৫), পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালি গ্রামের আনসার (৪৫) ও শরীয়তপুর জেলার শখিপুর গ্রামের শফিক (২৮)। বাকিদের পরিচয় জানা যায়নি।

ঘটনার বর্ণনা নিয়ে নাটক : সড়ক দুর্ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে নাটক সাজানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে বেসরকারি দুটি টেলিভিশনে সংবাদ প্রকাশ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। বাসচালক জাকিরের বক্তব্য নিয়ে ওই দুটি টেলিভিশনে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, বাসটি ডাকাতের কবলে পড়েছিল। তবে আহতরা জানিয়েছে, বাসে কোানো ডাকাতির ঘটনা ঘটেনি। চালক নিজেকে বাঁচাতে এমন বক্তব্য দিয়ে নাটক সাজাতে চাইছে। ফরিদপুরের পুলিশ সুপার জামিল হাসান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সোনারতরী বাসের চালক জাকির যে ডাকাতির ঘটনা সাজিয়েছেন তা মিথ্যা। এ ধরনের কোনো ঘটনাই ঘটেনি।

তদন্ত কমিটি গঠন : দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে ফরিদপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আবদুর রশিদকে প্রধান করে এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অপর সদস্যরা হলেন- ফরিদপুরের এএসপি (ভাঙ্গা সার্কেল) সামসুল হক পিপিএম, ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্স ফরিদপুরের সহকারী পরিচালক খন্দকার সামসুদ্দোহা, বিআরটিএ’র ফরিদপুরের সহকারী পরিচালক মো. নুরুজ্জামান এবং হাইওয়ে পুলিশ মাদারীপুর অঞ্চলের সহকারী পুলিশ সুপার বেলাল হুসাইন। কমিটিকে আগামী ৭দিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আহতদের চিকিৎসার জন্য সব ব্যয়ভার গ্রহণ করা এবং নিহতদের দাফন ও সৎকারের জন্য প্রত্যেকের পরিবারের কাছে ১০ হাজার টাকা সাহায্য প্রদান করা হয়।

এদিকে কলাপাড়া প্রতিনিধি অমল মুখার্জী জানিয়েছেন, ভাঙ্গায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ৮ জনের বাড়িই পটুয়াখালীর কলাপাড়ার বিভিন্ন ইউনিয়নে। নিহতদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম।

Leave a Reply